নিজস্ব প্রতিবেদক | শেখ মনিরুল ইসলাম সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, সময় সংবাদ.নিউজ
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাতেও আবাসন ব্যবসার নামে প্রতারণার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর তদারকির ঘাটতির সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র বিলাসবহুল অফিস, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, বহুতল ভবনের ছবি এবং কথিত আবাসন প্রকল্পের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল ও আশপাশের এলাকায় একাধিক প্রতিষ্ঠান রিয়েল এস্টেট ও আবাসন প্রকল্পের নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কেউ কেউ শেয়ার বিক্রি, জমি প্রদর্শন কিংবা জমিতে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও প্রচার-প্রচারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ভবনের ছবি ও উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি।
এমন অভিযোগের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলা সিটি পিএলসি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম। মতিঝিলের গাউছেপাক ভবনের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, একটি অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সংগৃহীত অর্থের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা অফিস সজ্জা, যাতায়াত, আপ্যায়ন ও অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে। এসব ব্যয়ের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল ইসলাম-এর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালক।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে তার একটি অংশ আবার সাবলেট দিয়েছে। একই সঙ্গে সংগৃহীত অর্থের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি টাকার জমি ক্রয় করা হয়েছে, যা সংগৃহীত অর্থের তুলনায় অনেক কম।
এদিকে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের মধ্যেও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কেন্দ্র করে দুটি পৃথক গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
কয়েকজন শেয়ারহোল্ডারের অভিযোগ, আর্থিক লেনদেন ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। এমনকি ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মারধরের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিক পরিচয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলেও একই ধরনের আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাংলা সিটি পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার না করে সাংবাদিককে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন বলে প্রতিবেদকের দাবি।
আবাসন খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি না থাকলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কারণে সাধারণ মানুষ বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তারা বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান শেয়ার বা বিনিয়োগের নামে অর্থ সংগ্রহ করছে, তাদের বৈধতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাই করা জরুরি।
ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টরা সরকারের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বহু গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার তাদের কষ্টার্জিত অর্থ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
(চলবে — দ্বিতীয় পর্বে: বাংলা সিটি পিএলসি’র অর্থ সংগ্রহ, শেয়ার বণ্টন, প্রকল্পের বাস্তবতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধান)
