সী-উইড: বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

রিমন হাওলাদার ফামিম: ঢাকা,

শুক্রবার ৩ জুলাই-২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত হিসেবে নীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) ক্রমশ গুরুত্ব লাভ করছে। ৭১০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং বিস্তৃত সামুদ্রিক অঞ্চলের অধিকারী বাংলাদেশ সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের অসাধারণ সুযোগ পেয়েছে। এই সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে সি-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল অন্যতম, যা এখনও দেশের অর্থনীতিতে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সি-উইডকে “সবুজ সোনা” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, জৈব সার, পশুখাদ্য এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে এর বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো সি-উইড শিল্পকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাত গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সি-উইড ও সি-উইডজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
বাংলাদেশের কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন এবং উপকূলীয় অন্যান্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ সি-উইড চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি, পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং অনুকূল আবহাওয়া এই খাতের বিকাশে বিশেষ সহায়ক। ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা ও পরীক্ষামূলক উদ্যোগে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সি-উইড চাষ লাভজনক হতে পারে এবং তা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি করতে সক্ষম।
সি-উইডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিবেশগত উপকারিতা। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সামুদ্রিক শৈবাল কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করে। ফলে সি-উইড চাষ একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনে, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণেও অবদান রাখে।
উপকূলীয় অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সি-উইড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাছ ধরা মৌসুমের বাইরে অনেক জেলে ও উপকূলবাসী আয়ের সংকটে পড়েন। সি-উইড চাষ তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ খাত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম।
তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে সি-উইড খাত এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব, উন্নত প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, প্রশিক্ষণের স্বল্পতা, অর্থায়নের সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা এই শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি উৎপাদিত সি-উইড সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের জন্য আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি।
এক্ষেত্রে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। সি-উইড চাষে প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা, গবেষণা সহায়তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সি-উইড বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
বিশ্ব যখন সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, তখন বাংলাদেশেরও উচিত সি-উইডসহ অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা। নীল অর্থনীতির এই সম্ভাবনাময় খাত শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথই খুলে দেবে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে সি-উইড হতে পারে বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।
কাজী গোলাম সারোয়ার
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক